শঙ্খ ঘোষ : ছোট ৪ টি কবিতা (উদাসীনা, মিথ্যে, বৃষ্টি, দশমী)

কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতার ভাবনা মূলত মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও সভ্যতার প্রশ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছে; তিনি প্রতিষ্ঠান ও একনায়ক তন্ত্রের বিরুদ্ধে কবিতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাব্য চেতনায় কয়েকটি প্রধান ভাবনা-সূত্র লক্ষ্য করা যায়: ১. আত্মবোধ ও সত্তার সন্ধান ২. ইতিহাস-সভ্যতা ও রাজনৈতিক চেতনা, ৩. শহর, বিজ্ঞাপন ও আধুনিক জীবনের অসঙ্গতি ৪. রবীন্দ্র-জীবনানন্দ-উত্তর কবিতার ধারা ৫. প্রতিরোধ ও মানবিক মূল্যবোধ।


কবির কবিতায় “জীবন মানেই হলো আত্মবোধে নিজেকে সাজানো; নিজের সত্তার কাছে সত্য হতে চাওয়াই জীবন” — এই ধরনের উক্তিগুলো আত্মপরিচয় ও অন্তর্দৃষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরে। কবি মানুষকে বাইরের কোলাহলের ভিড়ে নিজের ভেতরের সত্য খুঁজে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন।


তাঁর কবিতায় ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে ; তিনি একনায়কতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে।  “বাবরের প্রার্থনা”-র মতো গ্রন্থে ইতিহাস-সভ্যতার জটিলতা, ক্ষমতার দর্প ও মানুষের দুর্দশার ছবি ফুটে উঠেছে।

“মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”, “হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ” — এই ধরনের শিরোনাম ও ভাবনা আধুনিক শহরজীবন, ভোগবাদ ও মিডিয়ার প্রভাবের সমালোচনা করে। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ বিজ্ঞাপন ও ভিড়ের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব হারাচ্ছে।

শঙ্খ ঘোষকে জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রতিনিধিস্থানীয় কবি বলা হয়; তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের পরেও কবিতার নতুন ভাষা ও ভাব তৈরি করেছেন।  তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রচর্চার গভীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায় (যেমন: “ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ” গবেষণা গ্রন্থ)। 


তাঁর কবিতা কেবল সুন্দর শব্দ নয়, বরং প্রতিরোধের কবিতা; যেখানে মানুষের মর্যাদা, ন্যায় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলা হয়েছে। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি পাঠককে প্রশ্ন করতে, ভাবতে ও দাঁড়াতে শেখান।



উদাসীনা


পা ছুঁয়ে যে প্রণাম করি সে কি কেবল দিনযাপনের নিশান?
আমি কেবল দেখতে চেয়েছিলাম
নির্জীব পা সরিয়ে নাও কিনা।

দুঃখ এত ঝরাই, সে কি জানতে চেয়ে দেবদূতেরা কী চান?
আমি কেবল দেখতে চেয়েছিলাম
তোমার মুখে সত্যিকারের ঘৃণা।

এখন আমি বুঝতে পারি আমায় নিয়ে কী চাও তুমি।
দুপুর জ্বালার মধ্যখানে
সূত্রপাতে অবসানে
তুমি আমায় দেখতে চেয়েছিলে
দু-হাত ধরেও থাকব উদাসীনা।

মিথ্যে


এই মুখ ঠিক মুখ নয়
মিথ্যে লেগে আছে
 এখন তোমার কাছে যাওয়া
ভালো না আমার।

তুমি স্নেহে সুদক্ষিণা বটে
মেঘময় ঠোঁট নেমে আসে
তোমার চোখের জলে আজও
পুণ্যে ভরে ওঠে রুদ্ধ দেশ
 আমি তবু ছিঁড়ে যাই দূরে
এই মুখ ঠিক মুখ নয়
হলুদ শরীর থেমে যায়
বোধহীন, তাপী
তোমার অনেক দেওয়া হলো
আমার সমস্ত দেওয়া বাকি।

বৃষ্টি  


আমার দুঃখের দিন তথাগত
আমার সুখের দিন ভাসমান।
এমন বৃষ্টির দিন পথে-পথে
আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।

আবার সুখের মাঠ জলভরা
আবার দুঃখের ধান ভরে যায়।
এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে
আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।

দশমী



তবে যাই
যাই মণ্ডপের পাশে ফুলতোলা ভোরবেলা যাই
খাল ছেড়ে পায়ে পায়ে উঠে-আসা আলো

যাই উদাসীন দেহে শুরুগুরু বোধনের ধ্বনি
যাই সনাতন বলিদান

কপালে দীঘল ভালো পূজার প্রণাম
যাই মুখটাকা জবা চত্বর অঙ্গন বনময়

যাই ছায়াময় ভিড়ে মহানিশি আরতির ধোঁয়া
দোলে স্মৃতি দোলে দেশ দোলে ধুনুচির অন্ধকার

মঠের কিনার ঘিরে কেঁপেওঠা বনবাসী হাওয়া
যাই পিতৃপুরুষের প্রদীপ-বসানো দুঃখ, আর

ঠাকুমা যেমন ঠিক দশমীর চোখে দেখে জল
যাই পাকা সুপুরির রঙে-ধরা গোধূলির দেশ
আমি যাই

কবি শঙ্খ ঘোষ জীবন পঞ্জী : 


কবি শঙ্খ ঘোষ (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ – ২১ এপ্রিল ২০২১) ছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিমান কবি, সাহিত্য-সমালোচক ও রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ; জীবনানন্দ-পরবর্তী প্রজন্মে তাঁকে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের উত্তরসূরী হিসেবে গণ্য করা হয়। 


জন্ম, পরিচয় ও শিক্ষাজীবন


আসল নাম ছিল চিত্তপ্রিয় ঘোষ; সাহিত্যজগতে পরিচিত শঙ্খ ঘোষ নামেই। 

জন্ম: ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২, অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুরে (তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা); পৈত্রিক নিবাস বরিশালের বানারিপাড়া। 

পিতা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ (অধ্যাপক), মাতা অমলা ঘোষ। 

শিক্ষা: 

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর; পরে যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতীতে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। 

সাহিত্যজীবন ও কাব্যধারা:

প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘দিনগুলি রাতগুলি’ (১৯৫৩, কৃত্তিবাস পত্রিকা); একই শিরোনামে ১৯৫৬-তে প্রথম কাব্যগ্রন্থ। 
কবিতায় তিনি মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও সভ্যতার প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন; প্রতিষ্ঠান ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার। 

রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের পর বাংলা কবিতার ধারায় তিনি স্বতন্ত্র ভাব-ভাষার প্রবর্তক হিসেবে পরিগণিত। 

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম:
এখন সময় নয় (১৯৬৭)
আদিম লতাগুল্মময় (১৯৭২)
বাবরের প্রার্থনা (১৯৭৬)
প্রহরজোড়া ত্রিতাল (১৯৮২)
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে (১৯৮৪)
হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ (২০১১), প্রতি প্রশ্নে জেগে ওঠে ভিটে (২০১২), বহুস্বর স্তব্ধ পড়ে আছে (২০১৪) ইত্যাদি। 

উপন্যাস: 

সকাল বেলার আলো (১৯৭২), 
সুপুরি বনের সারি (১৯৯০)। 

পুরস্কার ও সম্মাননা:

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য। 
২০১৬ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। 

মৃত্যু

কবি ২১ এপ্রিল ২০২১, কলকাতায় প্রয়াত হন; মৃত্যুকালে বয়স ৮৯। 
(তথ্য : এ আই )


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন